কোহল বার্গের নৈতিক বিকাশের তত্ত্বটি শিক্ষাগত তাৎপর্যসহ ব্যাখ্যা কর।
কোহল বার্গের নৈতিক বিকাশের তত্ত্বটি শিক্ষাগত তাৎপর্যসহ ব্যাখ্যা কর।
কোহল বার্গের নৈতিক বিকাশের তত্ত্ব:
লরেন্স কোহলবার্গ (Lawrence Kohlberg) একজন আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী, যিনি নৈতিক বিকাশের (Moral Development) একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব প্রস্তাব করেছেন। তার তত্ত্বটি পিয়াজের জ্ঞানীয় বিকাশের তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কোহলবার্গ বিশ্বাস করতেন যে, মানুষ নৈতিক যুক্তির বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়, এবং এই স্তরগুলো সার্বজনীন ও অপরিবর্তনীয়।
কোহলবার্গের নৈতিক বিকাশের স্তরসমূহ:
কোহলবার্গ নৈতিক বিকাশকে তিনটি প্রধান স্তর এবং প্রতিটি স্তরে দুটি করে উপ-স্তরে ভাগ করেছেন। মোট ছয়টি পর্যায় রয়েছে:
১. প্রাক-প্রচলিত নৈতিকতা (Pre-conventional Morality): এই স্তরটি সাধারণত শৈশবে দেখা যায়। এই স্তরে শিশুরা তাদের নিজস্ব স্বার্থ এবং শাস্তির ভয় দ্বারা চালিত হয়।
পর্যায় ১: শাস্তি ও আনুগত্য অভিমুখী (Obedience and Punishment Orientation): এই পর্যায়ে শিশুরা শাস্তি এড়াতে এবং পুরস্কার পাওয়ার জন্য নিয়ম মেনে চলে। তারা কোনো কাজের ফলাফল দ্বারা তার নৈতিকতা বিচার করে।
উদাহরণ: "আমি চুরি করব না কারণ তাহলে আমাকে শাস্তি পেতে হবে।"
পর্যায় ২: ব্যক্তিগত স্বার্থ অভিমুখী (Individualism and Exchange): এই পর্যায়ে শিশুরা তাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানোর জন্য কাজ করে। তারা বোঝে যে অন্যেরাও তাদের নিজস্ব প্রয়োজন মেটাতে চায়। "আমার জন্য কী লাভ হবে?" - এই প্রশ্নটি তাদের নৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
উদাহরণ: "তুমি যদি আমার পেন দাও, তাহলে আমি তোমাকে আমার খাতা দেব।"
২. প্রচলিত নৈতিকতা (Conventional Morality): এই স্তরটি সাধারণত কৈশোরকালে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে দেখা যায়। এই স্তরে ব্যক্তিরা সমাজের নিয়মকানুন, প্রত্যাশা এবং অন্যের অনুমোদনকে গুরুত্ব দেয়।
পর্যায় ৩: ভালো ছেলে/ভালো মেয়ে অভিমুখী (Good Interpersonal Relationships): এই পর্যায়ে ব্যক্তিরা অন্যের দ্বারা প্রশংসিত হতে এবং তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে চায়। তারা "ভালো ছেলে/ভালো মেয়ে" হিসেবে পরিচিত হতে চায়।
উদাহরণ: "আমি সত্য কথা বলব যাতে সবাই আমাকে ভালো ছেলে বলে।"
পর্যায় ৪: আইন ও শৃঙ্খলা অভিমুখী (Maintaining the Social Order): এই পর্যায়ে ব্যক্তিরা সমাজের আইন-কানুন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। তারা বিশ্বাস করে যে সমাজের সুস্থ্য পরিবেশের জন্য নিয়ম মেনে চলা অপরিহার্য।
উদাহরণ: "ট্র্যাফিক আইন মেনে চলা উচিত কারণ এটি সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখে।"
৩. উত্তর-প্রচলিত নৈতিকতা (Post-conventional Morality): এই স্তরটি খুব কম সংখ্যক প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে দেখা যায়। এই স্তরে ব্যক্তিরা নিজস্ব নৈতিক নীতি ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়, যা সমাজের প্রচলিত নিয়মকানুন থেকে ভিন্ন হতে পারে।
পর্যায় ৫: সামাজিক চুক্তি ও ব্যক্তিগত অধিকার অভিমুখী (Social Contract and Individual Rights): এই পর্যায়ে ব্যক্তিরা বোঝে যে, সমাজ হলো এমন একটি চুক্তি যেখানে ব্যক্তিগত অধিকার ও সমাজের ভালোকে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। তারা অনুভব করে যে কিছু আইন সমাজের উপকারের জন্য পরিবর্তন করা যেতে পারে।
উদাহরণ: "যদিও আইন ভঙ্গ করা ঠিক নয়, কিন্তু যদি কোনো আইন মানুষের মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে, তবে তা পরিবর্তন করা উচিত।"
পর্যায় ৬: সর্বজনীন নৈতিক নীতি অভিমুখী (Universal Ethical Principles): এই পর্যায়ে ব্যক্তিরা সর্বজনীন নৈতিক নীতি, যেমন ন্যায়বিচার, সমতা, মানবতা, ইত্যাদি দ্বারা পরিচালিত হয়। তাদের নৈতিক সিদ্ধান্ত সমাজের আইন বা অন্যের প্রত্যাশা দ্বারা প্রভাবিত হয় না, বরং তাদের নিজস্ব সুসংগত নৈতিক নীতি দ্বারা নির্ধারিত হয়। কোহলবার্গ বিশ্বাস করতেন যে খুব কম মানুষই এই স্তরে পৌঁছাতে পারে।
উদাহরণ: "জীবন বাঁচানো যেকোনো আইনের ঊর্ধ্বে, তাই প্রয়োজনে আইন ভাঙা যেতে পারে।"
কোহলবার্গের তত্ত্বের শিক্ষাগত তাৎপর্য:
কোহলবার্গের নৈতিক বিকাশের তত্ত্ব শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একজন শিক্ষক এই তত্ত্বের সাহায্যে শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন:
a)শিক্ষার্থীদের নৈতিক স্তরের স্বীকৃতি: শিক্ষকরা এই তত্ত্বের সাহায্যে বুঝতে পারেন যে একজন শিক্ষার্থী নৈতিকতার কোন স্তরে রয়েছে। এটি শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষণ কৌশল এবং নৈতিক দ্বিধা উপস্থাপন করতে সাহায্য করে।
b)নৈতিক আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি: নৈতিক দ্বিধা বা দ্বন্দ্ব (Moral Dilemmas) উপস্থাপন করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক আলোচনাকে উৎসাহিত করা উচিত,যাতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যা বিশ্লেষণ করতে এবং তাদের নৈতিক যুক্তিকে উন্নত করতে পারে । যেমন, কোহলবার্গের বিখ্যাত "হাইঞ্জের দ্বিধা বা দ্বন্দ্ব " (Heinz Dilemma) শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করে তাদের নৈতিক চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটানো যেতে পারে।
d)পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি: শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন নৈতিক স্তরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করা উচিত। নৈতিক আলোচনায় প্রতিটি মতামতের গুরুত্ব দেওয়া এবং তাদের যুক্তির পেছনে কী চিন্তা কাজ করছে তা বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
e)মূল্যবোধ শিক্ষার উপর গুরুত্ব: পাঠ্যক্রমের মধ্যে মূল্যবোধ শিক্ষা বা Value Education অন্তর্ভুক্ত করাঅবশ্যই উচিত। শিক্ষার্থীদের সততা, সহানুভূতি, ন্যায়বিচার, সহযোগিতা ইত্যাদি নৈতিক মূল্যবোধ শেখানো উচিত।
f)ভূমিকা পালনের সুযোগ: শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ভূমিকা পালন করার সুযোগ দেওয়া উচিত, যা তাদের অন্য ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করতে এবং সহানুভূতিশীল হতে সাহায্য করবে।
g) গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি: বিদ্যালয়ে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা উচিত যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের মতামত প্রকাশ করতে এবং নিয়ম তৈরিতে অংশ নিতে পারে। এটি তাদের সামাজিক চুক্তি এবং ব্যক্তিগত অধিকারের ধারণা বুঝতে সাহায্য করবে।
h)শিক্ষকদের ভূমিকা: শিক্ষকদের নিজেদের নৈতিক আদর্শ স্থাপন করা উচিত এবং শিক্ষার্থীদের জন্য রোল মডেল হওয়া উচিত। তারা নৈতিক আচরণ ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সঠিক পথ দেখাতে পারেন।
পরিশেষে বলা যায় , কোহলবার্গের নৈতিক বিকাশের তত্ত্ব নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক কাঠামো প্রদান করে এবং শিক্ষার্থীদের নৈতিক চিন্তাভাবনার প্রক্রিয়া বুঝতে শিক্ষকদের সহায়তা করে।
Thanks for your beautiful article on your blogspot
ReplyDeleteGraphic Designing course in Delhi NCR,
Best computer course in Delhi
Best Fine art Institute in Delhi
Boutique Management with Cutting & Tailoring in Delhi NCR.